অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের তথ্য উঠেছে একাধিক শিক্ষা
আটোয়ারীতে এসএসসি’র রেজিস্ট্রেশনে অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে বলরামপুর ও রাখালদেবী হাট উচ্চ বিদ্যালয়
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি’র চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের তথ্য উঠেছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এতে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত এসএসসি রেজিস্ট্রেশন ফি’র বাইরে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উন্নয়ন ফি, কাগজপত্র সংরক্ষণ, অফিস খরচ কিংবা বিদ্যুৎ বিলের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক জানান, নির্ধারিত ফি’র বিষয়ে প্রশ্ন তুললে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাত দেখাচ্ছে। কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করেছেন, না হলে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হবে না—এমন আশঙ্কার কথা জানান তারা।
উপজেলার বলরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পরীক্ষার্থী জানান, “আমরা এবারে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করব। ফাইনাল পরীক্ষার আগে আমাদের টেস্ট পরীক্ষা হয়েছে। সেই পরীক্ষায় যারা ২/১ বিষয়ে ফেল করেছে তাদের কাছ থেকে প্রতি বিষয়ের জন্য ২০০ করে টাকা নেওয়া হয়েছে। অর্থ্যাৎ যারা ৩ বিষয়ে ফেল করেছে তাদের কাছ থেকে ৬০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যে (নিয়মিত) অনেকেই পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশন ফি’র সাথে অতিরিক্ত চারশো থেকে ছয়শো টাকা সহ ৩ হাজার টাকাও বেশি দিয়েছে।”
এছাড়াও জানা যায়, বলরামপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গত বছরে যারা অকৃতকার্য হয়েছিল এবারে রেজিষ্ট্রেশনের সময় তাদের কাছে থেকে মূল বোর্ড ফি’র বাইরে অতিরিক্ত পাঁচশো থেকে আটশো টাকা বেশি নিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ৷
এবিষয়ে বলরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কেশব রঞ্জন জানান, আমাদের বিদ্যালয় থেকে রেজিষ্ট্রেশনের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে সেটা পুরোপুরি সত্য নয়৷ তবে, আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দুই-আড়াইশ টাকা নিয়েছি। সেটা তাদের পিছনেই ব্যয় করার জন্য। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য ঠিক কোন খাতে ওই টাকা ব্যয় করা হবে তার জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি৷
অপরদিকে, উপজেলার বামনকুমার রাখালদেবী হাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি’র রেজিষ্ট্রেশন ফি’র নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছে তুমুল কান্ড। ওই বিদ্যালয় থেকে চলতি বছরে যারা (নিয়মিত) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন তাদের বেশিরভাগের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত অর্থ।
বামনকুমার রাখালদেবী হাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরীক্ষার্থী জানায়, ফাইনাল পরীক্ষার আগে আমাদের টেস্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যারা ২/৩ টি বিষয়ে ফেল করেছে রেজিষ্ট্রেশনের সময় তাদের কাছে ৩ হাজার করে টাকা নিয়েছে।
গত বছরে এক বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া দুই শিক্ষার্থী জানায়, গতবছরে আমি ২ বিষয়ে অকৃতকার্য হই৷ এবারে রেজিষ্ট্রেশনের সময় আমার কাছে মোট ১৬’শ টাকা নিয়েছে আমাদের আশরাফুল ইসলাম স্যার। কারো কাছে ১৫’শ, কারো কাছে ১৪’শ টাকা নিয়েছে আশরাফুল স্যার। এক পরীক্ষার্থীর মা জানায়, গত বছরে আমার ছেলেটা এক বিষয়ে ফেল করে। এবারে রেজিষ্ট্রেশন করতে গেলে ১১’শ টাকার এক টাকাও কম নেয়নি৷
এবিষয়ে বামনকুমার রাখালদেবী হাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রধান শিক্ষক শুধু আমাকে টাকা তোলার দ্বায়িত্ব দিয়েছিলেন৷ আমি কারো কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করিনি৷ অতিরিক্ত টাকা কেউ নিয়েছে কিনা তা প্রধান শিক্ষক বলতে পারবেন বলে তিনি জানান।
বামনকুমার রাখালদেবী হাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ আনোয়ার হোসেন জানায়, আমাদের স্কুলে এবারে তেমন বেশি টাকা নেওয়া হয়নি৷ তবে কিছুটা বেশি নেওয়া হয়েছে সেটা সত্য। আমাদের আনুষঙ্গিক কিছু খরচ থাকে তাই নেওয়া হয়েছে। আমাদের তো টুকটাক ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। তাই সংবাদ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে বিকাশে টাকা পাঠানোর অফার করেন ওই প্রধান শিক্ষক।
আর অনিয়মিত পরীক্ষার্থী যারা ইতোপূর্বে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে তাদের জন্য দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত নীতিমালা অনুযায়ী বলা হয়েছে পরীক্ষার ফি-১২৫, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ফি-৮০, অনিয়মিত ফি-১০০, স্কাউট ফি-২৫, গার্লস গাইট ফি-১৫ এবং সকল প্রকারের পরীক্ষার্থী যাদের ব্যবহারিক পরীক্ষা নেই জন প্রতি আরো ৪০০ টাকা সহ মোট ৭৪৫ টাকা আদায় করা যাবে। বিজ্ঞপ্তীতে আরো উল্লেখ আছে যে, উল্লেখিত ফি এর অতিরিক্ত ফি কোনোভাবেই আদায় করা যাবেনা৷ এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আটোয়ারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার লুৎফুল কবির মোঃ কামরুল হাসান বলেন, “এসএসসি রেজিস্ট্রেশনে বোর্ড নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে সচেতন মহল দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এ ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে না হয়।








