আটোয়ারীতে দেড় লক্ষ মানুষের ৫ জন চিকিৎসক, শয্যা সংকটে রোগীরা
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে চলছে চিকিৎসক ও জনবল সংকট। প্রায় দেড় লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র প্রধান আশ্রয়স্থল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫ জন। ফলে সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে প্রতিদিন শত শত রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
শুধু চিকিৎসক সংকটই নয়, হাসপাতালটিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদও রয়েছে ব্যাপক শূন্যতা। তৃতীয় শ্রেণির অনুমোদিত ৭২টি পদের মধ্যে ৩০টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ৩৪টি পদের মধ্যে ২২টি পদ শূন্য রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল জনবল দিয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ইনডোরসহ বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম চালাতে গিয়ে কর্মরতদের ওপরও পড়ছে অতিরিক্ত চাপ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যাবিশিষ্ট আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিতভাবে একশোরও বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। ফলে অনুমোদিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতে অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ধুলাবালির মেঝেতে অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে চিকিৎসা নেওয়ার দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের।
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রয়োজনীয় শয্যা না পাওয়ায় তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় স্বজনদের দুশ্চিন্তায় পড়তে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একই শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নারী ও শিশু রোগীরা। হাসপাতালে একজন গাইনি চিকিৎসক থাকলেও কিছুদিন আগে তিনি বদলি হয়ে যাওয়ার পর থেকে ওই পদটি শূন্য রয়েছে। ফলে গর্ভবতী নারীসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত নারী রোগীদের চিকিৎসাসেবা পেতে দুর্ভোগ বেড়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় শিশু রোগীদেরও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যেতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এই হাসপাতালই চিকিৎসার সহজলভ্য ঠিকানা। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল ও শয্যা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে।
জটিল রোগী কিংবা মুমূর্ষু রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। গাইনি ও শিশু বিশেষজ্ঞসহ প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর, রংপুর কিংবা ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়। এতে একদিকে যেমন রোগীদের চিকিৎসা পেতে সময় লাগছে, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপও তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রায় দেড় লাখ মানুষের জন্য একটি মাত্র উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ এই হাসপাতালেই চিকিৎসক ও জনবলের এমন ঘাটতি থাকায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় ছোটখাটো জটিলতাও অনেক সময় বড় শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতিকে স্থানীয়রা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। একদিকে চিকিৎসকের তীব্র সংকট, অন্যদিকে শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগীর চাপ সব মিলিয়ে সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু নতুন ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; হাসপাতালের অনুমোদিত চিকিৎসক ও কর্মচারীর শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে ৫০ শয্যার হাসপাতালটিকে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্প্রসারণ করে শয্যার সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গাইনি ও শিশু বিশেষজ্ঞসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
তাদের প্রত্যাশা, প্রায় দেড় লাখ মানুষের একমাত্র প্রধান চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট দ্রুত নিরসনে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী ও শয্যা নিশ্চিত করা গেলে এই এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসাসেবা আরও সহজ ও মানসম্মত হবে।
আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ অফিসার ডা. মোঃ হুমায়ুন কবির জানান, প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের হাসপাতালে ডাক্তার ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারীর সংখ্যা কম। অনুমোদিত ৪০ একজন ডাক্তারের বিপরীতে মাত্র ৫ জন ডাক্তার রয়েছে। মাত্র পাঁচজন ডাক্তার দিয়ে প্রতিদিন শত শত রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। অনুমোদিত শূন্য পদগুলো পূরণ এবং পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে বলে তিনি জানান। অতি শীঘ্রই অনুমোদিত শূন্য পদগুলো পূরণ এবং পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগের মাধ্যমে আটোয়ারী বাসীর জন্য চিকিৎসা সেবার মান আরো বাড়ানোর আশ্বাস দেন তিনি।





